রবিবার, জুন ২৪, ২০১৮
হালকা হিমেল হাওয়ায় রাঙ্গামাটি প্রর্যটনে প্রর্যটকদের আগামন শুরু

হালকা হিমেল হাওয়ায় রাঙ্গামাটি প্রর্যটনে প্রর্যটকদের আগামন শুরু

অনলাইন ডেস্কঃ
মৌসুমের শুরুতেই রাঙামাটিতে চোখে পড়ার মতো পর্যটকের আগমন ঘটছে বলে জানায়, পর্যটন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তারা জানান, পর্যটকদের আগমন ঘিরে নিরাপত্তা ও নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিতসহ প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি রয়েছে।

পর্যটন কর্পোরেশনের রাঙামাটির ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা জানান, এ কয়দিন ধরে পর্যটকের আগমন শুরু হয়েছে। বর্তমানে পর্যটন মোটেলের কক্ষগুলো প্রায় সময় শতভাগ বুকিং থাকছে। বিশেষ করে সরকারি ছুটির দিনগুলোতে পর্যটকদের আগমন বেশী থাকে।

ছুটির দিনে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে রাঙ্গামাটি। রাঙামাটির মনোরম ঝুলন্ত সেতু

এখনও দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে আছে। তবু পর্যটকরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন না। প্রতি শুক্র-শনিবারসহ সরকারি ছুটির দিনে গড়ে প্রায় হাজারের অধিক পর্যটকের রাঙামাটি আগমন ঘটছে বলে জানান তিনি।

সদ্য বর্ষার পর এখন শরতের শেষ বেলা। উঁকি দিচ্ছে শীত- যদিও অব্যাহত রয়েছে হালকা বৃষ্টিপাত। তবু আকাশে দেখা মেলে শুভ্র সাদা মেঘের মেলা। ধীরে ধীরে কমছে উঞ্চতার তেজ।

কখনো কখনো দোলা দিয়ে যায় মৃদু মন্দ হিমেল হাওয়া। চারদিকে ঘন সবুজ প্রান্তর। আকাশছোঁয়া পাহাড়মালা। মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে আঁকাবাঁকা স্বচ্ছ জলধারা কাপ্তাই হ্রদ। আর পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে অসংখ্য ঝরনাধারা। এসবের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে পাহাড়, হ্রদ আর ঝরনার প্রকৃতি রাঙামাটি। অবস্থান আমাদের প্রিয় ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে। ভ্রমণের এ মৌসুমে ঘুরে আসতে পারেন রাঙামাটি। উপভোগ করবেন প্রকৃতির নৈসর্গিক আধার।

জেলার পরিচিতি  ভৌগলিকঅবস্থান: পূর্ব নাম কার্পাস মহল। ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম নামে পৃথক জেলার সৃষ্টি। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান নামে তিনটি জেলায় বিভক্ত হয় ১৯৮৩ সালে। রাঙামাটি পার্বত্য জেলার আয়তন ৬ হাজার ১১৬ দশমিক ১৩ বর্গকিলোমিটার। জেলার সীমানা- উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণে বান্দরবান পার্বত্য জেলা, পূর্বে ভারতের মিজোরাম এবং পশ্চিমে খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রাম জেলা। এ জেলার দশ উপজেলা হল- সদর, কাপ্তাই, রাজস্থলী, বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি, বরকল, লংগদু, বাঘাইছড়ি, নানিয়ারচর ও কাউখালী।

জেলার মাঝ দিয়ে বয়ে চলা পাহাড়ি কন্যা কর্ণফুলি নদী সরাসরি মিশেছে বঙ্গোপসাগরে- যদিও তা বিচ্ছিন্ন করেছে কাপ্তাই বাঁধ। কর্ণফুলির উৎপত্তি ভারতের মিজোরাম রাজ্যের লুসাই পাহাড় হতে। কর্ণফুলি ঘিরে উৎপত্তি হয়েছে চেঙ্গী, মাইনি, কাচালং, সুবলং, রাইংখিয়ং, বরকল, হরিণা নদী। পরে এসব নদী মিলিয়ে গেছে কাপ্তাই হ্রদে।

সাম্প্রতিক: কাপ্তাই হ্রদ পরিবেষ্টিত পাহাড়, বন, ঝরনা আর স্বচ্ছ জলধারায় গড়ে ওঠা রাঙামাটির নৈসর্গিক আবেশ- যা সহজেই আকৃষ্ট করে প্রকৃতিপ্রেমীদের। এ বছর পাহাড় ধসের ঘটনার দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস পর রাঙামাটির নৈসর্গিক প্রকৃতির হাতছানি সাড়া মিলিয়েছে পর্যটকদের। রাঙামাটির মনোরম ঝুলন্ত সেতু এখন কাপ্তাই লেকের পানিতে তলিয়ে। তবু এবার মৌসুম শুরুতেই সাড়া মিলেছে প্রকৃতিপ্রেমী ভ্রমণপিপাসুদের।

১৩ জুন পাহাড় ধসের ঘটনায় সড়ক যোগাযোগ বিঘ্ন ঘটে। এতে রাঙামাটির পর্যটনে মরাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। হঠাৎ ধস নামে এখানকার পর্যটনে। এরই মধ্যে সড়ক যোগাযোগসহ সবক্ষেত্রে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে সার্বিক পরিস্থিতি। যে কারণে মৌসুমের শুরুতেই রাঙামাটিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পর্যটকের আগমন ঘটছে। শারদীয় দর্গোৎসবসহ সরকারি ছুটির দিনগুলোতে এবার যথেষ্ট পর্যটকের সমাগম হয়েছে বলে জানিয়েছেন, স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্টরা।

শহরের দোয়েল চত্ত্বরের আবাসিক হোটেল ‘প্রিন্স’ এর মালিক মো. নেছার আহম্মেদ জানান, শারদীয় দুর্গাপুজার ছুটিতে অনেক পর্যটক রাঙ্গামাটি বেড়াতে এসেছেন। গত সপ্তাহ হতে হোটেলে পর্যটকদের অগ্রিম বুকিং দেয়া আছে। পাহাড় ধসের ঘটনার পর এবারই পর্যটক আসা শুরু হয়েছে রাঙামাটিতে। এর আগে পাহাড় ধসের ঘটনায় দীর্ঘ সাড়ে  তিন মাস ধরে রাঙামাটি ছিল পর্যটকশূন্য।

রাঙামাটির পর্যটনের উন্নয়ন নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করলে স্থানীয় পর্যটন নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা বলেন, রাঙামাটি আসলে পর্যটনের জন্য খুবই সম্ভাবনার অঞ্চল। এখানে পাহাড়, হ্রদ, ঝরনার সমন্বয়ে গড়া প্রকৃতি যে কাউকে আকৃষ্ট করে তোলে।

কিন্তু প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনার অভাবে পর্যটনের দিক দিক থেকে রাঙামাটি এখনও পিছিয়ে। তাই রাঙামাটির পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে জেলা পরিষদ এরই মধ্যে ১২শ’ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে- যা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এখানকার পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগালে জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে দ্রুত অর্থনৈতিক অবস্থার পাল্টে যাবে।

দেখা যায়, এখন পর্যটন মৌসুম শুরু। সদ্য বর্ষা শেষে আগমন ঘটেছে শরতের মিষ্টিমাখা আমেজ। যদিও এখনও আসি আসি বার্তায় অপেক্ষমান শীত। এর মধ্যেই অবারিত পাহাড়, হ্রদ আর ঝরনার প্রকৃতি রাঙামাটির হাতছানি সাড়া দিতে শুরু করেছে প্রকৃতিপ্রেমীদের। চোখ খুলে তাকালেই দৃষ্টি মেলে আকাশছোঁয়া পাহাড়। এলোমেলো সারিতে সাজানো উঁচু নিচু ছোট বড় অসংখ্য পাহাড়ের সমাবেশ রাঙামাটি। মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে চোখ জুড়ানো আঁকাবাঁকা কাপ্তাই লেক। সবুজ পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে অসংখ্য পাহাড়ি ঝর্ণাধারা। নৈসর্গিক লীলাভূমি পাহাড়ি জনপদ রাঙামাটি যেন শৈল্পিক আঁকা জীবন্ত ছবি। প্রতিনিয়তই কাছে টানছে কাপ্তাই লেকের স্বচ্ছ জলধারা।

কাপ্তাই হ্রদ: ১৯৬০ সালে খড়স্রোতা কর্ণফুলী নদীর ওপর দিয়ে কাপ্তাইয়ে বাঁধ নির্মাণের ফলে সৃষ্টি হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ কৃত্রিম জলরাশি বিশাল কাপ্তাই হ্রদ। এর আয়তন প্রায় সাড়ে ৭শ’ বর্গকিলোমিটার। এই কাপ্তাই লেক ঘিরে গড়ে ওঠে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। কাপ্তাই লেকের স্বচ্ছ জলাধারায় নৌভ্রমণের রোমাঞ্চকর আনন্দ অনুভুতি উপভোগ করতে প্রতিনিয়ত ঘুরতে যান দেশী-বিদেশী পর্যটকরা। পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য আশেপাশে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত নৌপুলিশের টহল দল।

রাঙামাটি পর্যটন মোটেল ও ঝুলন্ত সেতু: রাঙামাটির মূল শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দক্ষিণে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের হলিডে কমপ্লেক্সের অবস্থান। সেখানেই নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিকাড়া ঝুলন্ত সেতুটি। যার পরিচিতি দেশে-বিদেশে। এ পর্যটন কমপ্লেক্সে মনোরম সেতু ছাড়াও রয়েছে কটেজ ও মোটেল। কাপ্তাই লেকে নৌভ্রমণের জন্য রয়েছে স্পীডবোট, প্যাডলবোট ও ইঞ্জিনবোটের সুবিধা। সড়ক পথে যাতায়াতে রয়েছে গাড়ির ব্যবস্থা।

আরও যা রয়েছে: শহর থেকে চার কিলোমিটার পূর্বে বালুখালীতে গড়ে তোলা হয়েছে সরকারি কৃষি বিভাগের কৃষিফার্ম, বেসরকারি পর্যটন স্পট টুকটুক ইকোভিলেজ, পেদাটিংটিং ও চাংপাং রেষ্টুরেন্ট। প্রায় ৬-৭ কিলোমিটার নদীপথে দূরত্বে জেলার বরকল উপজেলার সুবলং ইউনিয়নে অবস্থিত মনোরম সুবলং ঝরনা স্পট। শহরের উত্তরে নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাটে স্থাপিত হয়েছে বীরশ্রেষ্ট মুন্সী আবদুর রউফের স্মৃতিসৌধ। এসব স্থাপনায় যেতে হলে রিজার্ভ করে নিতে হয় স্পীডবোট অথবা ইঞ্জিনবোট।

সড়ক পথে শহরের আশেপাশে:জেলা সদরেই রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের উভয়পাশে সাপছড়িতে গড়ে তোলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ। মূল শহরে সংযুক্ত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাংলাদেশের প্রধান বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রাজবন বিহার। পাশে কাপ্তাই লেক পরিবেষ্টিত বিচ্ছিন্ন রাজদ্বীপে অবস্থিত চাকমা রাজার বাড়ি। কাপ্তাই লেক ঘেঁষে শহরের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী মনোরম ডিসি বাংলো। পাশে গড়ে তোলা হয়েছে জেলা পুলিশের বিনোদন স্পট পলওয়েল লাভ পয়েন্ট। রাঙ্গাপানির হেচারি এলাকায় স্থাপিত হয়েছে সুখী নীলগঞ্জ স্পট।

এ ছাড়া রাঙামাটির প্রবেশমুখে কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়ায় রয়েছে ঠান্ডাছড়ি চা বাগান, উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্র, কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনায় রয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম কাগজ কল কর্ণফুলি পেপার মিল (কেপিএম), কাপ্তাই বাঁধ, জাতীয় উদ্যাণ, নেভী ক্যাম্প, জুম প্যানোরমা স্পট, শিলছড়ি বনানী পর্যটন স্পট, চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার, ওয়াগ্গা চা বাগানসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ও স্থাপনা।

থাকাখাওয়া: থাকার জন্য রাঙামাটি পর্যটন মোটেলসহ হোটেল সুফিয়া, সাংহাই, মোটেল জজ, হোটেল নীডস হিল ভিউ, মাউন্টটেন ভিউ, গ্রিণ ক্যাসেল, আনিকা, প্রিন্সসহ শহরে রয়েছে অসংখ্য বিলাসবহুল আবাসিক হোটেল। খাওয়ার জন্য এসব প্রতিটি আবাসিক হোটেলের সঙ্গে এবং আশেপাশে রয়েছে উন্নতমানের খাবার হোটেল ও রেঁস্তোরা।

কীভাবে আসবেন: যেখান থেকে আসেন আসতে হবে চট্টগ্রাম হয়ে। ঢাকা থেকে সরাসরি রাঙামাটি যাতায়াতের জন্য চালু রয়েছে বিআরটিসি, এস আলম, শ্যামলী, ইউনিক, হানিফ, ডলফিনসহ বিভিন্ন বিলাসবহুল বাস সার্ভিস। এ ছাড়া চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি রাঙামাটি চালু রয়েছে পাহাড়িকা, বিআরটিসিসহ বিভিন্ন বাস সার্ভিস।

Attachments area