গোনাহের অভিশাপ থেকে নিজেকে পবিত্র করার হাতিয়ার

গোনাহের অভিশাপ থেকে নিজেকে পবিত্র করার হাতিয়ার

ইসলাম ডেস্ক ঃ 

তওবা-ইস্তেগফার একজন মোমিনের এক বড় গুণ। গোনাহের অভিশাপ থেকে নিজেকে পবিত্র করার হাতিয়ার। মানবীয় দুর্বলতার কারণেই আমরা শিকার হই শয়তানের কুমন্ত্রণার। আর তখন বিভিন্ন গোনাহের কাজে জড়িয়ে পড়ি। নবীদের আল্লাহ তায়ালা সবধরনের পাপাচার থেকে মুক্ত রেখেছিলেন। তারা নিষ্পাপ। কিন্তু তাদের ছাড়া অন্য সবার জীবনেই তো কমবেশি গোনাহ হয়ে থাকে। সে গোনাহ থেকে মুক্তির পথই হচ্ছে তওবা ও ইস্তেগফার অর্থাৎ কৃত গোনাহের জন্য আল্লাহর কাছে অনুতাপ ও অনুশোচনার সঙ্গে ক্ষমাপ্রার্থনা করা; ভুল পথ ছেড়ে মহান প্রতিপালকের দিকে ফিরে আসা। ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায়, মানুষ কোনো পাপে লিপ্ত হওয়ার পর যদি সে তার ভুল বুঝতে পারে এবং এজন্য সে কায়মনোবাক্যে তার মহান প্রভুর কাছে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করে, তাহলে সে গোনাহ যত বড়ই হোক না কেন, তা ক্ষমা করে দেওয়া হয়। তবে শর্ত হচ্ছে, তাকে তওবা করতে হবে খাঁটি মনে। অতীতের গোনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ভবিষ্যতে সে অন্যায় আর কখনও না করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। এমন তওবাই আল্লাহর কাছে গৃহীত হয়। যারা এমনভাবে তওবা করে, আল্লাহর ক্ষমার বর্ষণে তারাই সিক্ত হয়। শুধু মুখে মুখে তওবা করা কিংবা অন্যদের দেখাদেখি তওবার জন্য কিছু বাক্য মুখে আওড়ানো তওবার যথেষ্ট নয়। তওবা করতে হবে অবশ্যই মন থেকে এবং আর কখনও ওই গোনাহটি না করার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মন নিয়ে। হ্যাঁ, প্রথমবার যেমন শয়তানের প্ররোচনায় গোনাহ হয়ে গেল, তেমন তো পরে আবারও হতে পারে। তা হোক, যখনই গোনাহে জড়াবে, তখনই যদি আবার সে গোনাহের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং আবারও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়Ñ এ কাজ আর কখনও করবে না, তাহলে প্রতিবারই আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করবেন। আমরা তাঁর গোলাম, তাঁর বান্দা, তিনি আমাদের প্রভু, আমাদের প্রতিপালক। দুনিয়ায় কোনো কর্মচারী বা ভৃত্য যদি তার মনিবের কোনো আদেশ অমান্য করে এসে আকুতিভরে ক্ষমা চায়, তাহলে মনিব তাকে ক্ষমা করে। অথচ আল্লাহ তায়ালা মহাক্ষমাশীল। পাপ যত বড় হোক, যত বেশি হোক, তাঁর রহমত ও অনুগ্রহ দয়া এবং ক্ষমার তুলনায় তা মোটেও বড় নয়। বান্দা যখন তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে হাত বাড়ায়, তিনি তাতে অত্যন্ত খুশি হন। হাদিসে একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে এভাবেÑ এক লোক নির্জন মরুভূমিতে সফর করছে। তার সঙ্গে রয়েছে তার বাহন উট এবং সে উটের ওপরই রয়েছে তার খাবার ও পানি। সফরের এক পর্যায়ে সে উট থেকে নিচে নেমে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুম থেকে জেগে দেখল, তার উটটি তাকে রেখে চলে গেছে। মরুভূমির গরমে তার প্রচ- তৃষ্ণা পেল। কিন্তু তৃষ্ণা মেটানোর কিংবা সেখান থেকে ফিরে আসার অথবা হেঁটে লোকালয়ে চলে যাওয়ার মতো কোনো পথ তার সামনে ছিল না। মৃত্যুর জন্য অপেক্ষায় তখন একমাত্র পথ। নিরাশ মনে সে তখন ভাবল, যেখানে ঘুমিয়েছিলাম, সেখানেই আবার ঘুমিয়ে পড়ি। এমনি এক মুহূর্তে তার হারিয়ে যাওয়া উটটি ফিরে এলো। উটটি পেয়ে যেন সে মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে এলো। খুশির আতিশয্যে দিশাহারা হয়ে সে বলে উঠল, হে আল্লাহ! আমি তোমার প্রভু আর তুমি আমার গোলাম! রাসুলে করিম (সা.) এরশাদ করেন, ‘কোনো বান্দা যখন আল্লাহর কাছে তওবা করে, তখন তিনি তার তওবায় মরুভূমিতে উট হারিয়ে ফিরে পাওয়া এ ব্যক্তিটির চেয়েও বেশি খুশি হন।’ (মুসলিম)।

তওবা-ইস্তেগফার শুধু যে গোনাহ থেকে মুক্ত হওয়ার মাধ্যম এমন নয়, এর মাধ্যমে বান্দার আত্মিক উন্নতিও সাধিত হয়। হাদিসে আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘হে লোকসকল! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো। আমি তো তাঁর কাছে দৈনিক ১০০ বার তওবা করি।’ (মুসলিম : ৭০৩৪)। গোনাহ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র হওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রতিদিন এত বেশি পরিমাণে মহান প্রভুর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন।
পরকালীন কল্যাণের পাশাপাশি তওবার পার্থিব উপকারও রয়েছে। কোরআনে একাধিক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল। ফলে তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। তোমাদের ধনসম্পদ সন্তানসন্ততি বাড়িয়ে দেবেন। তোমাদের জন্য উদ্যানরাজি স্থাপন করবেন এবং তোমাদের উপকারার্থে নদী বইয়ে দেবেন।’ (সূরা নুহ : ১০-১২)। এ আয়াত থেকে আমাদের সামনে প্রতিভাত হয়Ñ বান্দা যদি আল্লাহর সামনে নিজের সব পাপ থেকে খাঁটি মনে তওবা করে, তাহলে পাপমুক্তির পাশাপাশি দুনিয়ার যাবতীয় প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থাও আল্লাহ করে দেবেন।