সবজীর মৌসুমেই কমছেনা সবজির দাম, থমথমে ক্রেতা বিক্রেতা

সবজীর মৌসুমেই কমছেনা সবজির দাম, থমথমে ক্রেতা বিক্রেতা

মোঃ কবির হোসেন ,রাঙ্গামাটি প্রতিনিধিঃ
মওসুম উৎরে গেছে অনেক আগেই, এতদিনে সব্জি বাজারে তোলার সময় হওয়ার কথা কিন্তু এখনও সবজি ক্ষেতে চাষও দিতে পারেনি রাঙামাটি জেলার জলেভাসা জমির কৃষকরা। এদিকে জেলার বাজারগুলোতে বাইরে থেকে আসার সবজির সরবরাহ কম থাকায় চড়াদামে বিক্রি করছে ব্যসায়ীরা, এই সুবাদে চরম বিপাকে আছে ভোক্তারা। মধ্যবিত্তরা কোনোভাবে চালিয়ে নিলেও খেটে খাওয়া মানুষ দিনের আয় খরচ করে সবজি ভাত জোগাড় করতেও হিমসিম খাচ্ছে।

প্রতিদিনের ঘাটতি পুরণে ধীরে ধীরে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এদিকে সামনের দিনগুলোতে রাঙামাটির সবজি বাজার আরো চড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করেছে রাঙামাটির ব্যবসায়ীরা। বনরূপা বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের জানায় স্থানীয় সবজি বাজারে না থাকায় জেলার বাইরে থাকা আনা সবজি দিয়েই তাদের প্রতিদিনের বাজার শেষ করতে হচ্ছে। বাইরে থেকে সবজি আনতে যেমন খরচ বেশী, কিনতে হচ্ছে চড়াদামে। আর এর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বাজারে এতে ব্যবসায়ীদের তেমন কোনো হাত নেই।

ব্যবসায়ীরা জানায় স্থানীয় সবজির চাষ নিয়ে কৃষকদের মাঝে যে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তা না কাটলে এ বছর রাঙামাটির সবজি বাজার যেমন নিয়ন্তণের বাইরে চলে যাবে, তেমনি চাষ না হলে কৃষকরা এবং প্রত্যন্ত এলাকার বাজারগুলোতেও বাইরে থেকে আনা সবজির চাহিদা বেড়ে গেলে সবজি ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যেতে পারে। পাশাপাশি কৃষকদের মাঝেও অর্থাভাবে দারিদ্র বেড়ে যেতে পারে।

নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের কাপ্তাই হ্রদে ১০৮ এমএসএল পানি ধরে রাখার কারণে জেলায় এই অনিশ্চয়তা দেখা দিয়ে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। এর রেশ ধরে চরম বিপাকে পড়তে যাচ্ছে কাপ্তাই হ্রদের জলে ভাসা জমির প্রান্তিক কৃষকরা। এ বছর হ্রদের পানি সময় মতো না কমানোর কারণে জমিতে চাষাবাদ শুরু করতে পারেনি জেলার কৃষক। এ কারণে চলতি মৌসুমে প্রায় কোটি টাকা আয় থেকে বঞ্চিত এবং কৃষকদের ঘরে খাদ্য মজুদের টানা-পোড়ন হবে বলে আশংকা করা হচ্ছে।

জেলার লংগদু, বাঘাইছড়ি, বরকল, কাপ্তাই, নানিয়ারচর, জুড়াইছড়ি, বিলাইছড়ি এবং সদরের বেশ কিছু জায়গা জুড়ে জলে ভাসা জমি রয়েছে। এই জমিগুলো হ্রদের পানিতে এখন পর্যন্ত তলিয়ে থাকায় স্থানীয় কৃষকরা চরম বিপাকে পড়েছে। সময় মতো পানি না কমার কারণে চাষীরা জমিতে বীজতলা তৈরি করতে পারেনি।

লংগদুর কৃষক সোনা মিয়া জানান, আমি প্রতিবছর ১০ একর জমিতে তরমুজ, আলু, মরিচ, টমেটো, ভূট্টো চাষ করি এবং একর প্রতি ১০-১২ হাজার টাকা উৎপাদন ব্যায় হয়। ফসল বিক্রি করে আমার লাভ হয় ৩৫-৪০ হাজার টাকা। চলতি মৌসুমে পানি না শুকানোর কারণে যথাসময়ে ফসল চাষ করা হয়নি। তারপরও গত সপ্তাহে তিন একর জমিতে বোরো ধান,দুই একর জমিতে মিষ্টি কুমড়া, লাউ, কাঁচামরিচ, টমেটোর চাষ করেছি।

এখন ভয় হচ্ছে ফসল ঘরে তোলার আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়তে হবে। তাই সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, যদি দ্রুত হ্রদে পানি কমানো যায় তাহলে চাষের পরিমাণ বাড়ানো যাবে অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমের আগে ফসল ঘরে তোলা যাবে।

নানিয়ারচরের কৃষক আব্দুল রহিম জানান, পানি শুকানোর পর আমি প্রতি বছর এ জমিতে ধান, মরিচ ও বেগুনের চাষ করি এবং সময় মতো ফসল ঘরে তোলে বাজারে বিক্রি করি। কিন্তু এবারে পানি না কমায় আমরা চিন্তিত আছি। কিছুদিনের জন্য পানি কমলেও ফসল তোলার আগে বর্ষা মৌসুম চলে আসবে।

বিলাইছড়ি সদরের কৃষক শ্যামল চাকমা বলেন, আমি একজন দরিদ্র মানুষ। প্রতিবছর হ্রদের পানি শুকানোর পর বোরো ধান, মরিচ, ঢেঁড়শের চাষ করি। কিন্তু পানি না কমায় আমি এবছর চাষাবাদ করতে পারছি না। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি পানি কমানোর। একই এলাকার সজিব চাকমা জানান, আমি প্রতি বছর ফুলকপি বাঁধাকপি, বেগুন, মরিচ, লালশাক, মিষ্টি কুমড়ার চাষ করি। পানি না কমায় আমিও চাষ করতে পারছি না, এখন আমাকে অর্থনৈতিক ভাবে কষ্ট পেতে হবে।

রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাগণ জানান, রাঙামাটিতে জলেভাসা জমি আছে ১৬,৬৮০ হেক্টর। কিন্তু গত বছর চাষ করা হয়েছে ৭৬৫০ হেক্টর জমিতে। তার মধ্যে সাড়ে চার হাজার হেক্টরে বোরো ধান এবং অন্যান্য জমিতে সবজি চাষ করা হয়েছে। এ বছর চাষাবাদের জন্য আমাদের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৭৭৩৬ হেক্টর। কিন্তু পানি না কমায় এ বছর কত হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হবে তা পানি শুকানোর উপর নির্ভর করবে। তবে কিছু কিছু এলাকায় পানি শুকানোর কারণে চাষ শুরু হলেও সম্প্রতি আবারো পানি বৃদ্ধির ফলে সেগুলো আবার তলিয়ে গেছে পানির নীছে।

কৃষি বিভাগ সূত্র আরো জানায়, জলে ভাসা জমির উপর কৃষকরা অনেকাংশে নির্ভরশীল। পার্বত্য অঞ্চলের খাদ্য শস্য উৎপাদনের বড় মাধ্যম হলো জলে ভাসা জমি। শীতের আগমনের সাথে এ জমি জেগে উঠে; আর জেগে উঠা জমিতে কৃষকরা ফসল ফলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু এ বছর কাপ্তাই হ্রদের পানি না কমায় এবারে চরম বিপাকে পড়েছে কৃষকরা। যদি দেরিতে ফসল ফলায় তাহলে কৃষকরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের স্বীকার হয়ে ফসল নষ্ট হবে অন্যদিকে আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখিন হবে। তাছাড়া সময় মতো চাষ না হওয়ায় এ বছর চাষীরা কোটি থাকা আয় থেকে বঞ্চিত হতে হবে।