নন্দীগ্রামে কালের বিবর্তনে বিলুপ্তির পথে গরুর হাল

নন্দীগ্রামে কালের বিবর্তনে বিলুপ্তির পথে গরুর হাল

নন্দীগ্রাম (বগুড়া) থেকে মো: ফজলুর রহমান : বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলায় এক সময় জমি চাষের প্রধান মাধ্যম ছিলো গরুর হাল। কিন্তু এখন কালের বিবর্তনে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার প্রসারের ফলে বিলুপ্তির পথে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য গরুর হাল। একসময় দেখা যেত সকালে ঘুম থেকে উঠে কৃষকরা কাঁধে লাঙল জোয়াল নিয়ে জমি চাষের জন্য মাঠে যেত। সেই দৃশ্যগুলো এখন শুধুই ঐতিহ্য। গ্রাম বাংলা থেকে গরুর হাল বিলুপ্তির প্রধান কারন হলো আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার। এক সময় ছিলো যখন গোলাভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ ও গোয়াল ভরা গরু এসবই গ্রাম বাংলার কৃষকদের প্রাচীন ঐতিহ্য হলেও বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারের ফলে সেই ঐতিহ্য এখন বিলুপ্তির পথে। জনসংখ্য বৃদ্ধির ফলে দিনকে দিন কমে যাচ্ছে আবাদী জমি ও বসত ভিটা। ফলে ভাটা পড়ছে গরু পালনে। ইচ্ছা থাকলেও গোয়াল ঘরের জায়গার অভাবে হয়ে উঠছে না আর গরু পালন। একসময় গরু ছাড়া কৃষিকাজ ছিল অসম্ভব যার কারনে কৃষকরা বাধ্য হয়েই গরু পালন করতো। এখন জমির সল্পতার কারনে গরু পালন ছেড়ে দিয়েছে অনেক কৃষক। বর্তমানে পাওয়ার ট্রিলার ও ট্রাক্টরের প্রচলনে হারিয়ে যেতে বসেছে গবাদী পশু দিয়ে হালচাষ। এক সময় যে কোন ফসল ফলানোর আগে গরু দিয়ে হাল চাষ করতো। কিন্তু এখন কৃষি ফসল ফলানোর জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হওয়ায় গরু দিয়ে হাল চাষ এখন বিলুৃপ্তির পথে । তবে এখনো গ্রামাঞ্চলে অল্প সংখ্যক গৃহস্থ পরিবারে চোখে পড়ে গরুর হাল। এক সময় হালচাষ করতে অনেক কৃষক বাড়িতে গরু পালন করতো। আবার অনেক কৃষক গরুর হাল কে পেশা হিসেবে ব্যবহার করতো এবং তা দিয়ে সংসার চালাত। গরু দিয়ে হাল চাষে সময় লাগলেও কৃষকরা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে গরুর হাল সংগ্রহ করতো। হালের গরু দিয়ে গরীব মানুষ তাদের পরিবারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতো। যেসব কৃষক গরু দিয়ে হালচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন কালের বিবর্তনে তারা পেশা হারিয়ে অন্য উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। প্রবীন কৃষক মুনির উদ্দিন, রইছ উদ্দিন, মজিবুর রহমান সহ বেশ কয়েক জনের সাথে কথা বললে তারা বলেন, ২০ বছর আগে আমরা গরু দিয়ে হালচাষ করতাম । হাল চাষ করেই আমরা সংসার চালাতাম। কিন্তু ধীরে ধীরে পাওয়ার ট্রিলারের প্রচলন হওয়ায় গরু দিয়ে হাল চাষের প্রচলন আর নেই বললেই চলে । অল্প সময়ে বেশি জমি চাষ করতে সক্ষম হওয়ায় জমির মালিকরা এখন পাওয়ার ট্রিলার ও ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করে নিচ্ছেন। কিন্ত্র এক সময় এই গরুর হাল ছিল একমাত্র মাধ্যাম। আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারের ফলে কৃষি ক্ষেত্রে অনেক সাফল্য এসেছে বলেও ত্রাা বলেন। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের অনেক কৃষক জানান, এক সময় খন্ড খন্ড জমিতে হাল চাষের একমাত্র মাধ্যম ছিল গরুর হাল। এখন ঐসব জমিতে ট্রিলার দিয়ে হালচাষ করতে অনেক বেগ পেতে হয়। চাষাবাদে আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার হওয়ায় ধীরে ধীরে গরুর হালচাষ হারিয়ে যাচ্ছে। তবুও অনেক কৃষক বাপ দাদার এই গরুর হাল চাষ পদ্ধত্বি টিকিয়ে রেখেছেন। হয়তো ভবিষ্যতে প্রযুক্তির আরো ব্যবহারের ফলে গ্রাম বাংলা থেকে একেবারে হারিয়ে যাবে গরুর হাল চাষ পদ্ধত্বি। কৃষকরা এখন কৃষিকাজে ব্যবহার করছে পাওয়ার ট্রিলার, ট্রাক্টর, ধান মাড়াই মেসিন, ধানকাটা মেসিন , ধান লাগোনো মেসিন, সার প্রয়োগের মেসিন সহ আধুনিক সব যন্ত্রপাতি। কিছু বছর আগেও গ্রামাঞ্চলে গরু দিয়ে হালচাষ, ধান মাড়াই করা হতো। এখন সেই দৃশ্য গুিল আর চোখে পড়েনা। এখন আর কৃষকরা ভোর বেলা পান্তাভাত খেয়ে লাঙল জোয়াল নিয়ে জমি চাষের উদ্দেশ্য বের হয় না। উপজেলার ১নং বুড়ইল ইউনিয়নের দোহার গ্রামের কৃষক মোহাম্মাদ আলী বলেন, আগের মত আর কেউ গরু দিয়ে হালচাষ করে না। এক সময় এই গরু দিয়ে হাল চাষ করেই সংসার চালাতাম। এখন মাঝে মধ্যে কেউ চাষ করে নিতে আসলে চাষ করে দেই। কি করবো বাপ দাদার পেশা এক বারে ছাড়তেও পারিনা তাই অন্য কাজের ফাঁকে বছরে দুই একবার হাল চাষ করি। এদিকে কৃষিকাজে শ্রম বেশি লাভ কম তাই অনেকে জমি ছেড়ে দিয়েছে। এছাড়া গোখাদ্যর মূল্য বৃদ্ধি, গোচারন ভূমীর সল্পতার কারনে গরু পালন ছেড়ে দিয়েছে অনেকে। এভাবেই নানা কারনে বিলুপ্তির পথে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য গরুর হাল।