ইসলাম

ক্রন্দন আল্লাহর ভয়ে

ইসলাম ডেস্ক

কোরআন এমনই এক বরকতময় কিতাব, যার সংস্পর্শের দ্বারা মানুষের অন্তর নরম হয়ে যায়। এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সর্বোত্তম বাণী সংবলিত কিতাব নাজিল করেছেন, যা পরস্পরে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পুনঃপুন পঠিত। এতে তাদের দেহচর্ম ভয়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে, যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করেমহান আল্লাহ মানবজাতিকে সৃষ্টিই করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য। যেমনটি তিনি নিজেই বলেছেনÑ ‘আমি জিন ও মানুষকে শুধু আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা জারিয়াত : ৫৬)। এ ইবাদতের সারকথা হলোÑ মানুষ সবসময় সব কাজে আল্লাহ তায়ালার আদেশ ও নিষেধ মেনে তাঁর দয়া ও অনুগ্রহের ভিখারি যেমন থাকবে, তেমনি তাঁর ভয়ে সর্বদা ভীতও থাকবে। আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দার এ ভীত হওয়া এবং ভয়ের কারণে চোখ ভিজিয়ে রাখার চরিত্রটা খুবই পছন্দ করেন। এ কারণেই দেখা যায়, আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করা ছিল নবী-রাসুল ও পূর্ববর্তী বুজুর্গদের বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য। কারণ অন্তরের ঈমান ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভয়ের নিদর্শনই হলো এ ক্রন্দন। সুতরাং আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে যার চোখ বেয়ে দুই ফোঁটা অশ্রুও বের হয় নাÑ এমন পাষাণ হৃদয়ের অধিকারী কখনও পূর্ণ মোমিন হতে পারে না। সঙ্গে সঙ্গে এমন ক্রন্দনকারীর জন্য আখেরাতে রয়েছে মর্যাদাপূর্ণ স্থান ও সুখময় জান্নাত। ইসলাম তাই আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে তবে কম হাসতে এবং অধিক কাঁদতে।’ (বোখারি ও তিরমিজি)।
অন্যত্র আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি যা দেখি তোমরা তা দেখো না। আর আমি যা শুনতে পাই তোমরা তা শুনতে পাও না। আসমান তো চড়চড় শব্দ করছে। আর সে এই শব্দ করার যোগ্য। তাতে এমন চার আঙুল পরিমাণ জায়গাও নেই, যেখানে কোনো ফেরেশতা আল্লাহর জন্য সেজদারত নেই। আল্লাহর শপথ! আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে, তাহলে তোমরা খুব কম হাসতে, বেশি কাঁদতে এবং বিছানায় স্ত্রীদের উপভোগ করতে না। বাড়িঘর ছেড়ে পথে-প্রান্তরে বেরিয়ে পড়তে এবং চিৎকার করে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে যে, আল্লাহর শপথ! হায়, আমি যদি একটি গাছ হতাম এবং তা কেটে ফেলা হতো! (ইবনে মাজাহ)। অন্যদিকে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করার অনেক ফজিলত ও মর্যাদাও বর্ণিত হয়েছে। এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারীর সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনকারীর জাহান্নামে যাওয়া এমন অসম্ভব, যেমন দোহনকৃত দুধ ফের ওলানে ফিরে যাওয়া অসম্ভব।’ (তিরমিজি)।অন্য এক হাদিসে ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, জাহান্নামের আগুন দুই ধরনের চোখকে কখনও স্পর্শ করবে না। এক. আল্লাহর ভয়ে যে চোখ ক্রন্দন করে এবং দুই. আল্লাহর রাস্তায় যে চোখ পাহারা দিয়ে বিনিদ্র রাত অতিবাহিত করে। (তিরমিজি)।
ক্রন্দনকারীর আরেকটি মর্যাদা হলো, হাশরের ময়দানে যখন সব মানুষ ভয় ও আতঙ্কে থাকবে, তখন এ ব্যক্তি নিরাপদ ও নিশ্চিন্তে আল্লাহর আরশের ছায়ায় অবস্থান করবে। এক হাদিসে এমন নিশ্চিন্ত সাত শ্রেণির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একশ্রেণির কথা হাদিসে এভাবে এসেছেÑ ‘এবং ওই ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণকালে যার দুই চোখ দিয়ে অশ্রুধারা বইতে থাকে।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
এভাবে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনকারীর জন্য আল্লাহর আজাব থেকে নিরাপদ থাকার কথাও হাদিসে উল্লেখ হয়েছে। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা (পূর্ববর্তী) আজাবপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের লোকালয়ে ক্রন্দনরত অবস্থা ব্যতীত প্রবেশ করবে না। যদি কান্না না আসে তবে সেখানে প্রবেশ করবে না। যাতে তাদের ওপর যে আজাব আপতিত হয়েছিল, তা তোমাদের ওপর আপতিত না হয়।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
তাছাড়া আল্লাহর ভয়ে নির্গত অশ্রু ফোঁটা আল্লাহ তায়ালার কাছে খুবই প্রিয়। হাদিসে আবু ওমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘দুটি ফোঁটা ও দুটি চিহ্নের চেয়ে অধিক প্রিয় আল্লাহর কাছে অন্য আর কিছু নেই। এক. আল্লাহর ভয়ে নিঃসৃত অশ্রু ফোঁটা। দুই. আল্লাহর পথে নির্গত রক্তের ফোঁটা। আর চিহ্ন দুটি হলোÑ আল্লাহর রাস্তার কোনো চিহ্ন ও আল্লাহর দেওয়া কোনো ফরজ আদায় করতে গিয়ে কোনো চিহ্ন।’ (তিরমিজি)।
অন্যদিকে যাদের অন্তর কঠিন ও আল্লাহভীতিশূন্য তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা কঠোর বাণী উচ্চারণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘দুর্ভোগ ওই লোকদের জন্য, যাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণের ব্যাপারে কঠোর। তারা সুস্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে।’ (সূরা জুমার : ২২)।
আর অন্তর কঠোর হওয়ার কারণটা রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর হাদিসে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, বান্দা যখন একটি গোনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। অতঃপর যখন সে গোনাহের কাজ পরিহার করে, ক্ষমাপ্রার্থনা করে এবং তওবা করে, তখন তার অন্তর পরিষ্কার ও দাগমুক্ত হয়ে যায়। সে আবার পাপ করলে তার অন্তরে আবার দাগ পড়ে এবং এক পর্যায়ে তার পুরো অন্তর কালো দাগে ঢেকে যায়। আর এটাই হলো সেই মরিচা, যা আল্লাহ তায়ালা তার কোরআনে বর্ণনা করেছেন, ‘কখনই না। বরং তাদের অপকর্মগুলো তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়েছে।’ (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)।
বোঝা গেল, পাপের কারণেই মূলত অন্তর কঠিন হয়ে যায় এবং এর ফলেই সেই অন্তরে আর আল্লাহভীতি জাগ্রত হয় না। তবে ইসলাম আমাদের অন্তর বিগলিত করে তাতে আল্লাহ তায়ালার ভয় আনয়ন ও অশ্রু বিসর্জনের কিছু উপায়ও বাতলে দিয়েছে। যেমনÑ
কোরআন তেলাওয়াত করা : কোরআন এমনই এক বরকতময় কিতাব, যার সংস্পর্শের দ্বারা মানুষের অন্তর নরম হয়ে যায়। এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সর্বোত্তম বাণী সংবলিত কিতাব নাজিল করেছেন, যা পরস্পরে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পুনঃপুন পঠিত। এতে তাদের দেহচর্ম ভয়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে, যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে। অতঃপর তাদের দেহ-মন আল্লাহর স্মরণে বিনীত হয়। এটা হলো আল্লাহর পথপ্রদর্শন। এর মাধ্যমে তিনি যাকে চান পথপ্রদর্শন করেন। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে পথ দেখানোর কেউ নেই।’ (সূরা জুমার : ২৩)।
এক হাদিসে আবদুুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বললেন, আমার সামনে কোরআন তেলাওয়াত করো। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি আপনার সামনে কোরআন পড়ব, অথচ আপনার ওপরই তা নাজিল হয়েছে? তিনি বললেন, অন্যের তেলাওয়াত শুনতে আমার ভালো লাগে। আমি তখন তাঁর সামনে সূরা নিসা তেলাওয়াত করলাম। আমি যখন এ আয়াতে এসে পৌঁছলাম, ‘অতএব সেদিন কেমন হবে, যেদিন আমি প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষী (নবী) আনব এবং তোমাকে তাদের সবার ওপর সাক্ষী বানাব?’ (সূরা নিসা : ৪১)। তখন তিনি বললেন, বেশ। যথেষ্ট হয়েছে। এবার থাম। এ সময় আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখলাম তাঁর দুই চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে। (বোখারি)।
দ্বীনি আলোচনা শ্রবণ : বেশি বেশি দ্বীনি আলোচনা শ্রবণ করার দ্বারাও অন্তর নরম হয় ও আল্লাহর ভয়ে চোখে অশ্রু চলে আসে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সুতরাং যে শাস্তিকে ভয় করে তাকে উপদেশ দান করো কোরআনের সাহায্যে।’ (সূরা কাফ : ৪৫)।
অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘আপনি উপদেশ দিতে থাকুন। কারণ উপদেশ মোমিনদের উপকারে আসবে।’ (সূরা জারিয়াত : ৫৫)।
হাদিসে এসেছে, ইরবাজ ইবনে সারিয়াহ (রহ.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার ফজর নামাজের পর আমাদের মর্মস্পর্শী ওয়াজ শোনালেন, যাতে আমাদের সবার চোখে পানি চলে এলো এবং অন্তর কেঁপে উঠল। এক ব্যক্তি বলল, এটা তো বিদায়ী ব্যক্তির নসিহতের মতো মনে হচ্ছে। হে আল্লাহর রাসুল! এখন আপনি আমাদের কী উপদেশ দিচ্ছেন? তিনি বললেন, আমি তোমাদের আল্লাহভীতির এবং (আমিরের আদেশ) শ্রবণ ও মান্য করার উপদেশ দিচ্ছি। (তিরমিজি ও আবু দাউদ)। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবার অন্তরে খোদাভীতি এবং চোখে আল্লাহর ভয়ের অশ্রু দিয়ে ভরে দিন! আমিন।